চট্টগ্রামের মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প নিয়ে সাম্প্রতিক পত্রিকা রিপোর্ট আমাদের উন্নয়ন ধারণার একটি গুরুতর অসঙ্গতি সামনে এনে দিয়েছে। প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সংরক্ষণ ডিপো, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, যদিও তা দুই বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিচালন কাঠামোর অভাবে।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি ধারাবাহিক দুর্বলতার প্রতিফলন। আমরা একের পর এক বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করছি, গভীর সমুদ্র বন্দর, এমআরটি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব প্রকল্প পরিচালনার জন্য কি আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছি?
বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের উদাহরণই যথেষ্ট। ২০২৩ সালে উদ্বোধনের পরও এটি পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। পরিচালন ব্যয়, ফি নির্ধারণ এবং বিদেশি অংশীদারদের শর্ত; সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে: অবকাঠামো নির্মাণের আগ্রহ থাকলেও তা দক্ষতার সাথে পরিচালনার সক্ষমতা এখনও সীমিত।
এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক অপচয়ই নয়, বরং জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। বৈদেশিক ঋণ বা রিজার্ভ ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, কিন্তু সেগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তা এক ধরনের নীতিগত ব্যর্থতায় পরিণত হয়।
বিদেশি সহায়তা বা প্রযুক্তি গ্রহণ কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলাই টেকসই উন্নয়নের পথ। অন্যথায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ব্যয় বাড়বে, কিন্তু তার কার্যকারিতা সীমিতই থেকে যাবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দক্ষ জনবল তৈরি, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালন কাঠামো গড়ে তোলা এবং প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় এখন সময়ের দাবি।
উন্নয়ন কেবল দৃশ্যমান স্থাপনা নয়; উন্নয়ন হলো সেই সক্ষমতা, যা একটি জাতিকে নিজের সম্পদ নিজেই দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে শেখায়। এখন সময় এসেছে আমরা সেই দিকেই গুরুত্ব দিই।
স্টাফ রিপোর্টার 











