০৪:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতন: সমাজের বিবেককে জাগাতে হবে এখনই

বাংলাদেশে আনুমানিক ২৫ লাখ গৃহকর্মী বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। অনানুষ্ঠানিক এই শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে তারা পরিবার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু প্রতিদান হিসেবে অনেকেই পাচ্ছেন নির্যাতন, অবমাননা, এমনকি মৃত্যুও। প্রতি বছর গড়ে ৩০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারান—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসুখের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১,৫৬০ জন গৃহকর্মী শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা ও হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭৮ জন সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার। এই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।

গৃহকর্মীদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা কেবল আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিভেদ, মানবিক মূল্যবোধের অভাব, এবং ক্ষমতার অপব্যবহারেরই প্রাত্যহিক প্রতিফলন। দরিদ্র, অসহায়, এবং প্রভাবহীন হওয়ায় অনেকেই গৃহকর্মীদের মানুষ হিসেবে নয়, যেন “কাজের যন্ত্র” হিসেবে বিবেচনা করেন। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এই অবমূল্যায়ন দেখে বড় হয়, এবং একসময় তারাও সেই ব্যবস্থার ধারক হয়ে ওঠে।

গৃহকর্মীরা নারী হওয়ায় তারা দ্বিগুণ নিপীড়নের শিকার হন। শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও অতিরিক্ত শ্রমের চাপ তাদের জীবনে এক অসহনীয় বাস্তবতা তৈরি করে। সমাজের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যখন দিনের পর দিন ন্যূনতম সম্মান ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকে, তখন তা শুধুই একটি মানবিক সংকট নয়, বরং তা জাতীয় নৈতিকতার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, গৃহকর্মীরা শ্রম দেন, তারা ভিক্ষা করেন না। তারা আমাদের জীবনের একটি নির্ভরযোগ্য অংশ—তাদের সম্মান করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক সুবিচারের আবশ্যিকতা।

এখন সময় এসেছে—পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল স্তরে গৃহকর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর। প্রয়োজন যথাযথ আইন প্রয়োগ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, এবং গৃহকর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

গৃহকর্মীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে শুধু আইন নয়, দরকার বিবেকের জাগরণ। এই জাগরণ শুরু হোক আজ, এখন থেকেই।

টেগ :

টিআরসি নিয়োগ কেন্দ্র করে জেলা পুলিশের প্রস্তুতিমূলক ব্রিফিং অনুষ্ঠিত।

গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতন: সমাজের বিবেককে জাগাতে হবে এখনই

আপডেট সময় : ০৫:২০:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ মে ২০২৫

বাংলাদেশে আনুমানিক ২৫ লাখ গৃহকর্মী বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। অনানুষ্ঠানিক এই শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে তারা পরিবার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু প্রতিদান হিসেবে অনেকেই পাচ্ছেন নির্যাতন, অবমাননা, এমনকি মৃত্যুও। প্রতি বছর গড়ে ৩০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারান—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর অসুখের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১,৫৬০ জন গৃহকর্মী শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা ও হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭৮ জন সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার। এই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।

গৃহকর্মীদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা কেবল আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নয়, বরং সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিভেদ, মানবিক মূল্যবোধের অভাব, এবং ক্ষমতার অপব্যবহারেরই প্রাত্যহিক প্রতিফলন। দরিদ্র, অসহায়, এবং প্রভাবহীন হওয়ায় অনেকেই গৃহকর্মীদের মানুষ হিসেবে নয়, যেন “কাজের যন্ত্র” হিসেবে বিবেচনা করেন। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এই অবমূল্যায়ন দেখে বড় হয়, এবং একসময় তারাও সেই ব্যবস্থার ধারক হয়ে ওঠে।

গৃহকর্মীরা নারী হওয়ায় তারা দ্বিগুণ নিপীড়নের শিকার হন। শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও অতিরিক্ত শ্রমের চাপ তাদের জীবনে এক অসহনীয় বাস্তবতা তৈরি করে। সমাজের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যখন দিনের পর দিন ন্যূনতম সম্মান ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকে, তখন তা শুধুই একটি মানবিক সংকট নয়, বরং তা জাতীয় নৈতিকতার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, গৃহকর্মীরা শ্রম দেন, তারা ভিক্ষা করেন না। তারা আমাদের জীবনের একটি নির্ভরযোগ্য অংশ—তাদের সম্মান করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক সুবিচারের আবশ্যিকতা।

এখন সময় এসেছে—পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল স্তরে গৃহকর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর। প্রয়োজন যথাযথ আইন প্রয়োগ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, এবং গৃহকর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে মানবিক মূল্যবোধ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

গৃহকর্মীদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে শুধু আইন নয়, দরকার বিবেকের জাগরণ। এই জাগরণ শুরু হোক আজ, এখন থেকেই।