মে দিবস শুধু একটি দিবস নয়, এটি বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। আধুনিক শ্রম আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কিন্তু প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বেই ইসলাম শ্রমিকদের যে সম্মান ও অধিকারের নির্দেশনা দিয়েছে, তা আজকের শ্রম আইনের অনেক আগেই প্রবর্তিত হয়েছিল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনী এবং ইসলামী শিক্ষায় শ্রমিকের মর্যাদা নিয়ে যেসব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, তা মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের এক অনন্য নজির।

ইসলাম শ্রমকে অবজ্ঞার নয়, বরং সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। কোরআন-হাদীসে কাজ করা, পরিশ্রম করা এবং হালাল উপার্জনকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ন অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, “তোমাদের কেউ যদি তার রশি নিয়ে জঙ্গলে যায়, কাঠ কেটে বয়ে এনে তা বিক্রি করে, নিজের পেট ভরে এবং কারও কাছে হাত না পাতে, তবে তা তার জন্য উত্তম।” (বুখারি)
এ হাদীসের মাধ্যমে বুঝা যায়, একজন শ্রমিক যিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন, তিনি সম্মানিত। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা, হজের মতো রুকনে সীমাবদ্ধ নয় — বরং জীবিকার জন্য সৎভাবে শ্রম করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
শ্রমিকের মজুরি নিয়ে নবী করিম (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।” (ইবন মাজাহ)। এই হাদীসটি শুধু শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রদানের গুরুত্বই বোঝায় না, বরং সময়মতো এবং সম্মানের সাথে মজুরি দেয়ার ইসলামী নির্দেশনাও স্পষ্ট করে।
আজকের দিনে, যখন অনেক শ্রমিক মজুরি বঞ্চিত হন, সময়মতো বেতন পান না, তখন ইসলামের এই স্পষ্ট নির্দেশনা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে দাসপ্রথা প্রচলিত থাকলেও, ইসলাম তা ধাপে ধাপে বিলুপ্তির পথ তৈরি করে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) উনার অধীনে থাকা দাসদের মুক্ত করে দিয়েছেন। তাদেরকে খাবার-দাবার ও পোশাকে মালিকের সমতুল্য মর্যাদা দিতে বলেছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন, “তোমাদের অধীনস্থদের প্রতি সদয় হও। তোমরা যা খাও, তাদেরও তা খাওয়াও; যা পরিধান করো, তাদেরও তা পরিধান করাও।”
এটি শুধু সহানুভূতি নয়, এক ধরনের সামাজিক ন্যায়ের দাবি। দাস নয়, আজকের দিনের শ্রমিকদের প্রতিও এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযোজ্য। অধীনস্থদের প্রতি সদয় হওয়া, তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা — এটি ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ। এখানে অন্যথা করার কোনও সুযোগ নেই!
ইসলামে কোনো জাত-পাত নেই, ইসলামে শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যের কোনও স্থান নেই। একজন শ্রমিক, কুলি, কৃষক বা কারিগর— সমাজের সকল স্তরের লোক সবাই আল্লাহর কাছে সমান মর্যাদার অধিকারী। কোরআনে আল্লাহপাক বলেছেন, “মানুষের জন্য তার কষ্টের পরই রয়েছে প্রাপ্তি।” (সূরা আন-নাজ’আত: ৬) অর্থাৎ, পরিশ্রমের ফল ব্যর্থ হয় না। এটি শ্রমের প্রতি ইসলামের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ।
বর্তমান বিশ্বে মে দিবসকে শ্রমিকদের সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু ইসলাম শুধু সংগ্রাম নয়, শ্রমিকের অধিকারকে স্বতঃসিদ্ধ বলে গণ্য করেছে। তাই মে দিবসে আমাদের উপলব্ধি হওয়া উচিত, ইসলাম এক মানবিক, সম্মানজনক ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে বহু আগেই।
আজকের সমাজে যদি ইসলামী শ্রমনীতির বাস্তবায়ন দেখা গেলে শ্রমিক শোষণ, বেতন বঞ্চনা, কর্মক্ষেত্রে নিপীড়ন ও বৈষম্য অনেকটাই কমে আসত।
শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে ইসলাম যে স্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে, তা শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, বরং একটি ন্যায্য সমাজের একটি ভিত্তি। মে দিবসে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, ইসলাম শুধু শ্রমিকদের অধিকার স্বীকার করেনি, বরং তা রক্ষা করার স্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনাও দিয়েছে।
শ্রমিককে সম্মান করা, তার পরিশ্রমের মূল্য দেয়া এবং মানবিক আচরণ করাই ইসলামের বার্তা। এই বার্তাকে পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করাই হবে মে দিবসে ইসলামের আলোকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
মোহাম্মদ জাকারিয়া জামান
সম্পাদক, সমাজ বার্তা
zakariatanveer@gmail.com
স্টাফ রিপোর্টার 











