০৪:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগম _ রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু

শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে আপতর মিয়ার মেয়ে পিয়ারা বেগমের উঠতি বয়স ছিলো। যুবতীতে নাম লেখানো পিয়ারা বেগমের পিতা অভাব অনটনের সংসারে ছেলে মেয়ে নিয়ে যখন হিমসিম অবস্থায় তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। পিয়ারা বেগম তাঁর স্মৃতিচারণে জানান, দেশে যুদ্ধ যখন তুমুল পর্যায়ে তখন অগ্রহায়ণ মাসের কোনো এক তারিখে আমার বাবা আপতর মিয়া আমার ভাইয়ের বিবাহ ঠিক করেন। দিন তারিখ মনে নেই। বিয়ের রাকে আমাদের এলাকার রাজাকার খালেক তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। আমাদের পুরো গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। আমার ভাইয়ের বিয়ের দিন আমার বাবা ও ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলে। এছাড়া আমার পাশ্ববর্তী আত্মীয়-স্বজনসহ সাত জনকে গুলি করে মেরে ফেলে। রাজাকাররা শুধু মেরেই ক্রান্ত হয়নি, আমাকে চোখ বেঁধে নৌকায় তুলে একটি গ্রামে নিয়ে যায়। গ্রামের নামটি মনে নেই। আমাকে যে ঘরে রাখা হয় তার পার্শ্ববর্তী ঘরে আরো অনেক মহিলা ছিলো। সন্ধ্যা হলেই প্রতিটি ঘর থেকে কান্না শোনা যেতো। কিন্তু কে কার কান্না থামাবে। সন্ধ্যা হলে পাকিস্তানী আর্মি এসে আমাদের নিয়ে সারারাত মনোরঞ্জন করতো। তাদের মনোবাসনা শেষ হলে পালাক্রমে স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের দেহের উপর লুটিয়ে পড়ত। যেসব মহিলারা সহবাসে রাজী হতো না, তাদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ভোর বেলা গুলি করে মেরে ফেলতো। কোনো এক রাতে পাকিস্তানী সেনাদের অত্যাচার মারাত্মক আকার ধারন করলে আমি চিৎকার দিতে তাকি, তখন আমাকে বিবস্ত্র করে বন্দুক দিয়ে আঘাত করে এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এভাবে দিনের পর দিন আমাদের উপর ধর্ষণ অত্যাচার চলতে থাকে। এক নাগাড়ে সাত দিন আমার উপর চলে নির্যাতন। আমাকের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। সারা রাতের এসব চিৎকার পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়তো। এসব কান্নার আওয়াজ কোনো এক সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছালে উনারা আমাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। এবং খ- খ- যুদ্ধ করে আমিসহ অনেককে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। আবার অনেক মহিলাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়। তাদেরকে কবর পর্যন্ত দেয়া হয়নি। স্থানীয় রাজাকাররা হাওরে লাশ ফেলে দিতো।


সাত দিন পর বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গরু, ছাগল, হাস, মুরগি যা ছিলো সব নিয়ে গেছে। বাড়িঘর, সম্ভ্রম সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব তখন দেখা দেয় আরেক সমস্যা। মানুষগুলো আমাদের দেখে নানারকম কথাবার্তা বলতে থাকে। ফলে লোক লজ্জার ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। কোনো রকম কাজ না থাকায় অর্ধাহারে, অনাহারে দিনাতিপাত করতে হতো। তবে আমাদের গ্রামের মিলিক মিয়ার ছেলে কাছন মিয়া আমাকে বিবাহ করতে রাজি হন। তার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়। যুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। তিনিসহ আরো অনেকেই খবর পেয়েছিলেন রাজাকাররা আমাদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানী আর্মিদের কাছে তাদের মনোরঞ্জনের জন্যে সোপর্দ করে ছিলো। কাছন মিয়ার সঙ্গে তখনও আমার বিবাহ হয়নি তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আমাদের বন্দীদশার খবর পৌঁছে দিয়ে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের কোনো অবস্থার উন্নতি হয়নি। স্বামীর সংসারে দুই ছেলে নিয়ে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত ছিলাম। দীর্ঘদিন পর বীরাঙ্গনা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ হওয়ায় এখন সরকার কর্তৃক ভাতা পাচ্ছি। এক্ষেত্রে শাল্লা এবং দিরাইয়ের কিছু মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ভীষণ সহযোগিতা করেছেন। পরিশেষে আমার একটা কথা, আমি এবং আমরা যারা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেয়েছি আমরা মরে গেলেও যেন দেশের সাধারণ মানুষ ভালোবাসায় আগলে রাখেন।

বাইট/দ্বিপাল/সুনাম-২৩

টেগ :

টিআরসি নিয়োগ কেন্দ্র করে জেলা পুলিশের প্রস্তুতিমূলক ব্রিফিং অনুষ্ঠিত।

বীরাঙ্গনা পিয়ারা বেগম _ রনেন্দ্র তালুকদার পিংকু

আপডেট সময় : ০৮:৩৮:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৩

শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে আপতর মিয়ার মেয়ে পিয়ারা বেগমের উঠতি বয়স ছিলো। যুবতীতে নাম লেখানো পিয়ারা বেগমের পিতা অভাব অনটনের সংসারে ছেলে মেয়ে নিয়ে যখন হিমসিম অবস্থায় তখন দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। পিয়ারা বেগম তাঁর স্মৃতিচারণে জানান, দেশে যুদ্ধ যখন তুমুল পর্যায়ে তখন অগ্রহায়ণ মাসের কোনো এক তারিখে আমার বাবা আপতর মিয়া আমার ভাইয়ের বিবাহ ঠিক করেন। দিন তারিখ মনে নেই। বিয়ের রাকে আমাদের এলাকার রাজাকার খালেক তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। আমাদের পুরো গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। আমার ভাইয়ের বিয়ের দিন আমার বাবা ও ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলে। এছাড়া আমার পাশ্ববর্তী আত্মীয়-স্বজনসহ সাত জনকে গুলি করে মেরে ফেলে। রাজাকাররা শুধু মেরেই ক্রান্ত হয়নি, আমাকে চোখ বেঁধে নৌকায় তুলে একটি গ্রামে নিয়ে যায়। গ্রামের নামটি মনে নেই। আমাকে যে ঘরে রাখা হয় তার পার্শ্ববর্তী ঘরে আরো অনেক মহিলা ছিলো। সন্ধ্যা হলেই প্রতিটি ঘর থেকে কান্না শোনা যেতো। কিন্তু কে কার কান্না থামাবে। সন্ধ্যা হলে পাকিস্তানী আর্মি এসে আমাদের নিয়ে সারারাত মনোরঞ্জন করতো। তাদের মনোবাসনা শেষ হলে পালাক্রমে স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের দেহের উপর লুটিয়ে পড়ত। যেসব মহিলারা সহবাসে রাজী হতো না, তাদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ভোর বেলা গুলি করে মেরে ফেলতো। কোনো এক রাতে পাকিস্তানী সেনাদের অত্যাচার মারাত্মক আকার ধারন করলে আমি চিৎকার দিতে তাকি, তখন আমাকে বিবস্ত্র করে বন্দুক দিয়ে আঘাত করে এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এভাবে দিনের পর দিন আমাদের উপর ধর্ষণ অত্যাচার চলতে থাকে। এক নাগাড়ে সাত দিন আমার উপর চলে নির্যাতন। আমাকের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। সারা রাতের এসব চিৎকার পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়তো। এসব কান্নার আওয়াজ কোনো এক সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছালে উনারা আমাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। এবং খ- খ- যুদ্ধ করে আমিসহ অনেককে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। আবার অনেক মহিলাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়। তাদেরকে কবর পর্যন্ত দেয়া হয়নি। স্থানীয় রাজাকাররা হাওরে লাশ ফেলে দিতো।


সাত দিন পর বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গরু, ছাগল, হাস, মুরগি যা ছিলো সব নিয়ে গেছে। বাড়িঘর, সম্ভ্রম সব হারিয়ে যখন নিঃস্ব তখন দেখা দেয় আরেক সমস্যা। মানুষগুলো আমাদের দেখে নানারকম কথাবার্তা বলতে থাকে। ফলে লোক লজ্জার ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। কোনো রকম কাজ না থাকায় অর্ধাহারে, অনাহারে দিনাতিপাত করতে হতো। তবে আমাদের গ্রামের মিলিক মিয়ার ছেলে কাছন মিয়া আমাকে বিবাহ করতে রাজি হন। তার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়। যুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। তিনিসহ আরো অনেকেই খবর পেয়েছিলেন রাজাকাররা আমাদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানী আর্মিদের কাছে তাদের মনোরঞ্জনের জন্যে সোপর্দ করে ছিলো। কাছন মিয়ার সঙ্গে তখনও আমার বিবাহ হয়নি তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আমাদের বন্দীদশার খবর পৌঁছে দিয়ে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের কোনো অবস্থার উন্নতি হয়নি। স্বামীর সংসারে দুই ছেলে নিয়ে জীবন সংগ্রামে লিপ্ত ছিলাম। দীর্ঘদিন পর বীরাঙ্গনা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ হওয়ায় এখন সরকার কর্তৃক ভাতা পাচ্ছি। এক্ষেত্রে শাল্লা এবং দিরাইয়ের কিছু মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ভীষণ সহযোগিতা করেছেন। পরিশেষে আমার একটা কথা, আমি এবং আমরা যারা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেয়েছি আমরা মরে গেলেও যেন দেশের সাধারণ মানুষ ভালোবাসায় আগলে রাখেন।

বাইট/দ্বিপাল/সুনাম-২৩