০৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি – উসমান খাজা

উসমান খাজা

সমাজ বার্তা । খেলাধুলা । সাক্ষাৎকার

অভিজ্ঞতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সপ্তমবারের মতো অ্যাশেজ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন উসমান খাজা। সময়ের পরিক্রমায় এখন দলের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি—যা একসময় কল্পনাও করা যেত না।

এক সময় ছিল যখন এই বাঁহাতি ব্যাটারকে জাতীয় দলে দেখা যেত না দীর্ঘ সময়। অনেকে ভেবেছিলেন, তার অধ্যায় শেষ। কিন্তু সেটি ভুল ধারণা ছিল, কারণ খাজার প্রতিভা, দৃঢ়তা ও রানের ক্ষুধা কখনোই নিঃশেষ হয়নি।

এখন তিনি দলের ‘অভিভাবক শ্রেণীর’ একজন সদস্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে আসা এই ক্রিকেটার এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণ।

২০১১ সালের নববর্ষ টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের সময়ের সেই অচেনা অনুভূতির দিনগুলো এখন অতীত। তখনও এসসিজি ছিল তার দ্বিতীয় বাড়ি, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমে তিনি ছিলেন একা এক নবাগত। প্রায় ১৫ বছর পর, ৮৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে, এখন সেই ঘরটাই হয়ে উঠেছে তার নিজের বাড়ি।

খাজা বলেন, “আমি এই ছেলেদের সাথেই বড় হয়েছি। আমি সবচেয়ে বয়স্ক, কিন্তু আমি তো তখনই ছিলাম যখন স্টিভ স্মিথ প্রথম গ্রেড ক্রিকেটে উঠছিল। হ্যাজেলউডের সঙ্গে আমার খেলা হয়েছে, সে তখন ১৪ বছরের। স্টার্কের সঙ্গে খেলেছি সেকেন্ড একাদশে, আর ডেভি (ওয়ার্নার)-র সঙ্গে তো শৈশবের খেলাও ছিল।”

“মারনাস (লাবুশেন)-এর সঙ্গে খেলেছি কুইন্সল্যান্ডে, ট্র্যাভিস হেডকে (Heady) নেতৃত্ব দিয়েছি অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলে। নাথান লায়নের সঙ্গেও খেলেছি অনেক বছর ধরে। শুরুতে আমি নিজেকে একটু আলাদা মনে করতাম, কারণ আমি অস্ট্রেলিয়ান দলের প্রচলিত ছাঁচে মানাতাম না। কিন্তু ২০১৫ সালে ফিরে আসার পর পুরো অনুভূতিটাই বদলে যায়।”

“তখন যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি, তারাই ছিল মূল খেলোয়াড়। দলটা তখন অনেক আপন মনে হতো। তারা জানত আমি কেমন মানুষ, ফলে আমাকে বুঝত, স্বাগত জানাত। সেটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।


বিশ্বাসই তার প্রত্যাবর্তনের শক্তি

খাজার ক্যারিয়ার জুড়ে সমালোচনা পিছু ছাড়েনি। নিউ সাউথ ওয়েলসে বয়সভিত্তিক দলে থাকাকালীন সময় থেকেই শুনতে হয়েছে নানা কটু কথা। কখনো বলা হয়েছে তিনি যথেষ্ট ফিট নন, কখনো বলা হয়েছে “হোমওয়ার্ক করেন না”—এমন অভিযোগে বাদও পড়েছেন দলে থেকে।

২০২৩ সালে এমসিসি সদস্যদের কাছ থেকে লর্ডসে পাওয়া কটূ মন্তব্য ছিল সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার সময় খাজা নিজের কৈশোরের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “অনেকে আমার সংস্কৃতি বুঝত না। আমি রোজা রাখতাম, কেউ জানত না আমি কী করছি। কোচরা ভাবত, আমি অলস, পরিশ্রম করছি না। কিন্তু তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা, সারাদিন পানি বা খাবার ছাড়াই আমি অনুশীলন করতাম।”

তবে তার সহখেলোয়াড়রা খাজার ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে দেখেছেন তার চরিত্র ও নেতৃত্বগুণ। তার বিশ্বাস কখনো উপেক্ষিত হয়নি, বরং সেটাই তার দৃঢ়তার মূল উৎস।

খাজা বলেন, “আমি সাতবার বাদ পড়েছি। হয়তো অন্য কেউ হলে টিকে থাকতে পারত না। কিন্তু আমার বিশ্বাসই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। আমি জানতাম, সবকিছু আমার ইচ্ছামতো হবে না, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনাতেই আমার পথ নির্ধারিত।”

“আরবি একটি শব্দ আছে—‘তাওয়াক্কুল’। এর মানে হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা। ভালো কিছু হোক বা খারাপ, আমি বিশ্বাস করি এর পেছনে আমার জন্য আরও ভালো কিছু আছে। সেই বিশ্বাসই আমাকে প্রতিবার ফিরে আসতে সাহায্য করেছে।”


পরিবার ও বিশ্বাস—দুটি স্তম্ভ

আজকের উসমান খাজা কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি এক জন আদর্শ পারিবারিক মানুষও।

বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির পর যখন অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের সন্তানরা মাঠে খেলছিল, তখন খাজার চোখে আনন্দের ঝিলিক ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, “আমার জীবনে বিশ্বাস, পরিবার আর ক্রিকেট—এই ক্রমানুসারেই আছে। বিশ্বাস আমাকে স্থির রাখে, পরিবার আমাকে পূর্ণতা দেয়, আর ক্রিকেট হলো ভালোবাসা।”

তার স্ত্রী র‍্যাচেল খাজার জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ র‍্যাচেলকে আমাকে দিয়েছেন যেন আমি এই যাত্রায় শক্ত থাকতে পারি। আমি আবেগ প্রকাশে দুর্বল ছিলাম, কিন্তু র‍্যাচেলই আমাকে খুলে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি আমার শক্তির উৎস।”


রেকর্ডধারীর আরেকটি গ্রীষ্মের প্রস্তুতি

৩৯ বছরে পা রাখতে চলা খাজা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সিনিয়র ব্যাটারদের একজন। ৩৫ বছর বয়সের পর তিনি করেছেন ৩,১৬৬ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার অন্য যেকোনো ব্যাটসম্যানের চেয়ে বেশি।

২০২২ সালের সিডনি টেস্টে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করে নিজের পুনর্জন্ম ঘটান তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের মাটিতে শতরান করে প্রমাণ করেন, তিনিও পারেন কন্ডিশন জয় করতে।

তিনি বলেন, “চার বছর আগে কেউ যদি বলত আমি ৩৮ বছর বয়সেও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলব, আমি হাসতাম। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। ২০২৩ সালে বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কার পাওয়া আমার জন্য ছিল অবিশ্বাস্য সম্মান।”

“আমি অনেক উত্থান-পতন দেখেছি, কিন্তু আজ যা কিছু পেয়েছি, সেটি আমার নিজের যাত্রারই অংশ। আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেই আমি এগিয়ে যাব—এটাই আমার পথ।”

মূল লেখাঃ ফক্স স্পোর্টস, অস্ট্রেলিয়া https://tinyurl.com/54w7vp2d

টিআরসি নিয়োগ কেন্দ্র করে জেলা পুলিশের প্রস্তুতিমূলক ব্রিফিং অনুষ্ঠিত।

ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি – উসমান খাজা

আপডেট সময় : ০৪:২৯:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫

সমাজ বার্তা । খেলাধুলা । সাক্ষাৎকার

অভিজ্ঞতার এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সপ্তমবারের মতো অ্যাশেজ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন উসমান খাজা। সময়ের পরিক্রমায় এখন দলের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি—যা একসময় কল্পনাও করা যেত না।

এক সময় ছিল যখন এই বাঁহাতি ব্যাটারকে জাতীয় দলে দেখা যেত না দীর্ঘ সময়। অনেকে ভেবেছিলেন, তার অধ্যায় শেষ। কিন্তু সেটি ভুল ধারণা ছিল, কারণ খাজার প্রতিভা, দৃঢ়তা ও রানের ক্ষুধা কখনোই নিঃশেষ হয়নি।

এখন তিনি দলের ‘অভিভাবক শ্রেণীর’ একজন সদস্য। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে আসা এই ক্রিকেটার এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণ।

২০১১ সালের নববর্ষ টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকের সময়ের সেই অচেনা অনুভূতির দিনগুলো এখন অতীত। তখনও এসসিজি ছিল তার দ্বিতীয় বাড়ি, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমে তিনি ছিলেন একা এক নবাগত। প্রায় ১৫ বছর পর, ৮৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে, এখন সেই ঘরটাই হয়ে উঠেছে তার নিজের বাড়ি।

খাজা বলেন, “আমি এই ছেলেদের সাথেই বড় হয়েছি। আমি সবচেয়ে বয়স্ক, কিন্তু আমি তো তখনই ছিলাম যখন স্টিভ স্মিথ প্রথম গ্রেড ক্রিকেটে উঠছিল। হ্যাজেলউডের সঙ্গে আমার খেলা হয়েছে, সে তখন ১৪ বছরের। স্টার্কের সঙ্গে খেলেছি সেকেন্ড একাদশে, আর ডেভি (ওয়ার্নার)-র সঙ্গে তো শৈশবের খেলাও ছিল।”

“মারনাস (লাবুশেন)-এর সঙ্গে খেলেছি কুইন্সল্যান্ডে, ট্র্যাভিস হেডকে (Heady) নেতৃত্ব দিয়েছি অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলে। নাথান লায়নের সঙ্গেও খেলেছি অনেক বছর ধরে। শুরুতে আমি নিজেকে একটু আলাদা মনে করতাম, কারণ আমি অস্ট্রেলিয়ান দলের প্রচলিত ছাঁচে মানাতাম না। কিন্তু ২০১৫ সালে ফিরে আসার পর পুরো অনুভূতিটাই বদলে যায়।”

“তখন যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি, তারাই ছিল মূল খেলোয়াড়। দলটা তখন অনেক আপন মনে হতো। তারা জানত আমি কেমন মানুষ, ফলে আমাকে বুঝত, স্বাগত জানাত। সেটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।


বিশ্বাসই তার প্রত্যাবর্তনের শক্তি

খাজার ক্যারিয়ার জুড়ে সমালোচনা পিছু ছাড়েনি। নিউ সাউথ ওয়েলসে বয়সভিত্তিক দলে থাকাকালীন সময় থেকেই শুনতে হয়েছে নানা কটু কথা। কখনো বলা হয়েছে তিনি যথেষ্ট ফিট নন, কখনো বলা হয়েছে “হোমওয়ার্ক করেন না”—এমন অভিযোগে বাদও পড়েছেন দলে থেকে।

২০২৩ সালে এমসিসি সদস্যদের কাছ থেকে লর্ডসে পাওয়া কটূ মন্তব্য ছিল সেই একই ধারাবাহিকতার অংশ।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার সময় খাজা নিজের কৈশোরের কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, “অনেকে আমার সংস্কৃতি বুঝত না। আমি রোজা রাখতাম, কেউ জানত না আমি কী করছি। কোচরা ভাবত, আমি অলস, পরিশ্রম করছি না। কিন্তু তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা, সারাদিন পানি বা খাবার ছাড়াই আমি অনুশীলন করতাম।”

তবে তার সহখেলোয়াড়রা খাজার ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে দেখেছেন তার চরিত্র ও নেতৃত্বগুণ। তার বিশ্বাস কখনো উপেক্ষিত হয়নি, বরং সেটাই তার দৃঢ়তার মূল উৎস।

খাজা বলেন, “আমি সাতবার বাদ পড়েছি। হয়তো অন্য কেউ হলে টিকে থাকতে পারত না। কিন্তু আমার বিশ্বাসই আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। আমি জানতাম, সবকিছু আমার ইচ্ছামতো হবে না, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনাতেই আমার পথ নির্ধারিত।”

“আরবি একটি শব্দ আছে—‘তাওয়াক্কুল’। এর মানে হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা। ভালো কিছু হোক বা খারাপ, আমি বিশ্বাস করি এর পেছনে আমার জন্য আরও ভালো কিছু আছে। সেই বিশ্বাসই আমাকে প্রতিবার ফিরে আসতে সাহায্য করেছে।”


পরিবার ও বিশ্বাস—দুটি স্তম্ভ

আজকের উসমান খাজা কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি এক জন আদর্শ পারিবারিক মানুষও।

বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির পর যখন অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের সন্তানরা মাঠে খেলছিল, তখন খাজার চোখে আনন্দের ঝিলিক ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, “আমার জীবনে বিশ্বাস, পরিবার আর ক্রিকেট—এই ক্রমানুসারেই আছে। বিশ্বাস আমাকে স্থির রাখে, পরিবার আমাকে পূর্ণতা দেয়, আর ক্রিকেট হলো ভালোবাসা।”

তার স্ত্রী র‍্যাচেল খাজার জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ র‍্যাচেলকে আমাকে দিয়েছেন যেন আমি এই যাত্রায় শক্ত থাকতে পারি। আমি আবেগ প্রকাশে দুর্বল ছিলাম, কিন্তু র‍্যাচেলই আমাকে খুলে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি আমার শক্তির উৎস।”


রেকর্ডধারীর আরেকটি গ্রীষ্মের প্রস্তুতি

৩৯ বছরে পা রাখতে চলা খাজা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সিনিয়র ব্যাটারদের একজন। ৩৫ বছর বয়সের পর তিনি করেছেন ৩,১৬৬ রান, যা অস্ট্রেলিয়ার অন্য যেকোনো ব্যাটসম্যানের চেয়ে বেশি।

২০২২ সালের সিডনি টেস্টে দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করে নিজের পুনর্জন্ম ঘটান তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের মাটিতে শতরান করে প্রমাণ করেন, তিনিও পারেন কন্ডিশন জয় করতে।

তিনি বলেন, “চার বছর আগে কেউ যদি বলত আমি ৩৮ বছর বয়সেও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলব, আমি হাসতাম। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। ২০২৩ সালে বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কার পাওয়া আমার জন্য ছিল অবিশ্বাস্য সম্মান।”

“আমি অনেক উত্থান-পতন দেখেছি, কিন্তু আজ যা কিছু পেয়েছি, সেটি আমার নিজের যাত্রারই অংশ। আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেই আমি এগিয়ে যাব—এটাই আমার পথ।”

মূল লেখাঃ ফক্স স্পোর্টস, অস্ট্রেলিয়া https://tinyurl.com/54w7vp2d